Sign Up

Be the part of the Best Sex Stories, Erotic Fiction & Bangla Choti Golpo, bangla panu golpo.

Sign In

Login to our social questions & Answers Engine to ask questions answer people’s questions & connect with other people.

Forgot Password

Lost your password? Please enter your email address. You will receive a link and will create a new password via email.

Captcha Click on image to update the captcha.

You must login to ask a question.

Please briefly explain why you feel this question should be reported.

Please briefly explain why you feel this answer should be reported.

Please briefly explain why you feel this user should be reported.

SexStories Latest Articles

অন্তর্দ্বন্দ্ব মে 2026- চরম আনকাট ও এক্সক্লুসিভ পর্ব

পাঠকের কলমে (নন-ইরোটিক): রোজকার গরম আর উত্তেজনার মাঝে আজ নিয়ে এলাম একটু ভিন্ন স্বাদের ছোঁয়া! এটি কোনো অ্যাডাল্ট গল্প নয়। আমাদের এক একনিষ্ঠ পাঠকের লেখা চমৎকার একটি ছোটগল্প আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। রোজ রোজ মশলাদার গল্প পড়ার মাঝে এই স্নিগ্ধ গল্পটি আপনার মন ভালো করে দিতে পারে।

আবু সালেহ সপরিবারে মালিবাগে থাকেন। সালেহ সাহেব দেখতে অত্যন্ত সুপুরুষ। মলিবাগের দোতলা বাড়িটা তিনি পৈত্রিকসূত্রে পেয়েছিলেন। তিনি বেইলি রোডে অবস্থিত ভিকারুন্নেসা গার্লস স্কুলে এবং কলেজের জনপ্রিয় ফিজিক্সের টিচার। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তাঁর সুখের সংসার।

স্ত্রী সায়রা সুলতানা সিদ্ধেম্বরী গার্লস স্কুলের অংকের টিচার এবং তিনিও সালেহ সাহেবের মতই জনপ্রিয়। তাদের দুজনারই স্ব স্ব বিষয়ে সহজভাবে ছাত্রদের বোঝাবার আশ্চর্যরকমের ক্ষমতা আছে।

তাই খুব ভাল প্রাইভেট কোচিং টিচার হিসাবে তাদের দুজনারই নামডাক আছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বাসায় প্রাইভেট কোচিং করান। ফিজিক্স এবং অংকের জন্য ছাত্রের অভাব হয় না। দুজনের প্রত্যেকেই স্কুলের বেতন ছাড়াও মাসে ট্যাক্স ফ্রি লাখ টাকার উপরে ইনকাম করেন। টাকার অভাব নেই।

তিনি দোতলা বাড়িটা তিন ছেলে মেয়ের জন্য তিন তলা বানিয়ে ফেললেন। স্কুলের বয়স হয়ে গেলে সলেহ দম্পতি মেয়েকে ভিকারুন্নেসা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজে এবং ছেলেদের মতিঝিল বয়েস স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কয়েক বছরের ভেতরে দেখা গেল যে সাবিহা ভীষণ প্রতিভাধারী। ক্লাসে সব সময়েই প্রথম হয়।

ক্লাস ভাইবে উঠবার পর পরই সাবিহা বয়োঃপ্রাপ্ত হলে মা সায়েরা তাকে আলাদা একটা নিজস্ব রুমের ব্যবস্থা করে দিলেন। সব বাসায় যা হয় এখানেও তাই হল। সাবিহার ঘর সব সময়েই ফটফাট থাকে। আর অন্যদিকে উড়নচণ্ডি দুই ছেলের ঘর থাকে গোয়াল ঘরের মত।

সালেহ সাহেবের স্ত্রী সায়রা অত্যন্ত ফর্সা ও সুন্দরী। সন্তানদের ভেতরে মেয়ে সাবিহা সুলতানা সব চাইতে বড়। এর পর ছেলেরা সাবের সালেহ ও শাহাব সালেহ। সাবের ও শাহবের বয়সের পার্থক্য এক বছর করে তবে সাবিহা সাবেরের চেয়ে দুই বছরের বড়। সবার চেয়ে বড় মেয়ে সাবিহা মায়ের মত হয়েছে। অত্যন্ত ফর্সা, লম্বায় সাড়ে পাঁচ ফিট হবে।

স্লিম সাবিহার চেহারাটা অত্যন্ত কমনীয়। মুখটা মোটামুটি গোল, চোখদুটা দেবী সরস্বতীর মতই টানাটানা বড় বড়। চোখের মনি দুটা কুচকুচে কালো। সোজা খাড়া পাতলা নাক। ঠোঁটা দুটা মোনালিসা মার্কা আর মোনালিসা মার্কা এক চিলতে হাসি সব সময়েই ঠোঁটে লেগে থাকে।

গাল দুটা টোপলা টোপলা, হাসলে দুই গালেই টোল পরে। থুতনিটা একটু চোখা। কান দুটা মুখের সাথে নিখুতভাবে মানানসই। কানে লতি লম্বাটে নয়, গোলাকার। পাতলা লোমের ঘন কালো ভ্রূগুলোও সরস্বতী দেবীর মত নিখুতভাবে টানা। চোখের পাপড়িগুলো পাতলা তবে লম্বা লম্বা। চোখের ভ্রূর মত এগুলোও ঘন কালো।

ভিকারুন্নেসা গার্লস স্কুলে পড়ুয়া সাবিহা ক্লাস সেভেনে ওঠার পর থেকেই তার রূপ আর দেহসৌষ্ঠবের জন্য সবার নজরে আসতে শুরু করে। বয়স ও শরীরিক গঠন অনুযায়ী বুকের আকৃতি একদম মানানসই। তবে তার নিতম্বটা ছিল অসাধারণ ভাবে আকর্ষণীয়, একদম নিখুতভাবে গোল। নিতম্বের ষ্ফিতী ও বিস্তৃতি ছিল একটু বেশির দিকে।

মালিবাগ এলাকাটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত এলাকা। পাশেই একটা কাঁচা বাজার রয়েছে। সারা দিনই নানান কিসিমের লোক, টোকাই, স্কুল কলেজে পড়ুয়া মাস্তান ইত্যাদি এই এলাকায় ঘোরাঘুরি করে। এইসব মাস্তান টাইপের ছেলে ছোকরারা সাবিহাকে উত্যক্ত করা শুরু করলো। সবিহা যতক্ষণ স্কুলে থাকে ততক্ষণ নিরুপদ্রবে থাকে। স্কুল থেকে ফিরে আসার পর থেকেই শুরু হয় জ্বালাতন।

আরো বাংলা চটি

অবশেষে বিরক্ত হয়ে সালেহ সাহেব তার মালিবাগের বাড়িটা ভাড়া দিয়ে তেজকুনি পাড়ায় একটা এ্যাপর্টমেন্টে পাশাপাশি দুটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে চলে এলেন। একটা ফ্ল্যাটে কোচিং করান আর একটা ফ্ল্যাটে তিনি সপরিবারে থাকা শুরু করলেন।

সাবিহা বাবা মায়ের সাথেই ভিকারুন্নেসা গার্লস স্কুলে যায়। সাবিহা স্কুলে জুনিয়ার স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করে ক্লাস নাইন থেকে মেধা বৃত্তি পাওয়া শুরু করলো। বড় ছেলে সাবেরও বোন সাবিহার মতই মেধাবী। বোনের মতই সেও ক্লাস নাইন থেকে জুনিয়ার স্কুল সার্টিফিকেট বৃত্তিলাভ করেছিল।

সাবেরও দেখতে সুন্দর তবে একটু চেহারাতে মেয়েলী ভাব আছে। ফর্সা আর গোলগাল চেহারা, ভরাট গাল। চোখ নাক সবই নায়ক সূলভ। তার ছিল অসম্ভব রকমের মেয়ে পটানোর ক্ষমতা। মেয়েরা এমন কি বয়সে বড় মেয়েরাও খুব সহজেই তার প্রেমে পড়ে যেত। তাই তার শত্রুও ছিল বেশি।

ছোট ছেলে শাহাব আবার দেখতে মোটামুটি ভালই, তবে গড়পরতার একটু উপরেই বলতে হবে। তবে ওর স্বাস্থ্যাটা খোদা প্রদত্ত। পেশিবহুল শরীর হলেও শাহাব কিন্তু কোন দিনই কোন শরীরচর্চা কেন্দ্রে যায় নাই। দেখলেই বোঝা যায় যে তার শরীরে অসম্ভব শক্তি।

শাহাব বড় ভাইকে সব রকম বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করে। একবার বড় ভাইকে তার প্রেমিকার তিন ভিলেনদের হাত থেকে একাই রক্ষা করেছিল। সেই সময়ে প্রতিপক্ষের ছুরির আঘাতে শাহাবের পিঠে একটা ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল। ঐ ক্ষতের চিহ্নটা শাহাবের শরীরে স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল।

শাহাবের মুখটা একটু লম্বাটে, গাল দুটা বসা, একটু মোটা আর কালচে ঠোঁট। চুলগুলো ঘন কালো তবে কোঁকড়া কোঁকড়া। গায়ের রংটা একটু শ্যামলার দিকে। শাহাব আবার পড়াশোনায় খুব ভাল না হলেও, ক্লসে রোল নম্বর দশের ভেতরেই থাকে।

বেলা দেড়টা বাজে। সারিকা আর বান্ধবী সোহানা, ধানমন্ডির ৫ নম্বর রোডে সারিকার বাড়ির গেটের সামনে রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছিল। এই সময়টা রাস্তা ঘাট একটু ফাঁকা থাকে আর গাড়ি ঘোড়াও কম থাকে।

এই সময়ে তারা একটা ভীষণভাবে পুরুষাল ও সুগঠিত যুবককে হেঁটে আসতে দেখল। ছেলেটাকে দুই বান্ধবীরই চোখে লেগে গেল। এই সময়েই অপর দিক থেকে দুই যুবক এসে ঐ যুবককে ঘিড়ে ধরতে দেখল। ওরা বুঝতে পারল যে ঔ যুবকটা দুই ছিনতাইকারির কবলে পরেছে।

দুই বান্ধবী কিছু বুঝে উঠবার আগেই দেখল যে ছিনতাইকারির একজন একটা ছুড়ি দিয়ে প্রথম যুবককে কোপ দিল। কি ভাবে যে কি হয়ে গেল সারিকা দেখল যে ছুরিধারি ছিনতাইকারি আর্ত চিৎকার দিল আর ওর একটা হাত সুতায় বাঁধার মত করে ওর শরীরে ঝুলছে। অপর ছিনতাইকারি তার বন্ধুকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ওখান থেকে চলে গেল। প্রথম যুবকটি, যেন কিছুই হয় নাই এই রকম একটা ভাব নিয়ে ওদের সামনে দিয়েই চলে গেল।

দুই বান্ধীই মুগ্ধ চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটার চেহারা সারিকার মনে গেথে রইল।

ঘটনাটার সময়ে শাহাব ধানমন্ডির চার নম্বর রোডে ওর বন্ধুর সাথে আড্ডা মেরে হেঁটে হেঁটে রাপা প্লাজায় যাচ্ছিল। রাপা প্লাজায় আর এক বন্ধু জনির বাবার বেশ বড়সর একটা কসমেটিক্সের দোকান আছে। দোকানটা বেশ চালু। সব সময়েই ভীর লেগেই থাকে।

কসমেটিক্সের দোকান তাই স্বাভাবিকভাবেই মেয়েদের বিশেষ করে যুবতীদের ভীর বেশি থাকে। দুই বন্ধুকেই দোকানে আগত যুবতী ক্রেতারা আকর্ষণ করত। তাই দুই বন্ধুই মাঝে মাঝে ছুটির দিনে যুবতীদের আকর্ষণে দোকানে বসত।

দুই বন্ধু দোকানে যতক্ষণ থাকত ততকক্ষণ কাউন্টারে সেলসম্যান হিসাবে আগত কলেজে পড়ুয়া মেয়েদের চাহিদা মাফিক কসমেটিক্স দেখাত আর ফ্লার্ট করত। ভীষণভাবে পুরুষালী সেলসম্যান শাহাবের সাথে যুবতীরাও খুনশুটি করে মজা পেত।

সেদিনও মজা করবার উদ্দেশ্যেই শাহাব রাপা প্লাজায় যাচ্ছিল। রাস্তায় দুই ছিনতইকারি ওর পথরোধ করে দাঁড়ায়।
“এই, যা আছে ভাল মানুষের মত বের করে দে।”
“না দিলে কি করবি?”
“দেখাচ্ছি কি করব।”
বলেই ছিনতাইকারিদের একজন একটা দশ ইঞ্চি হান্টার্স নাইফ বের করে দেখাল। শাহাব কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ছিনতাইকারি মেজাজ হারিয়ে হাত উঠিয়ে শাহাবের কাঁধ বরাবর একটা কোপ দিল।

শাহাব আশ্চর্য ক্ষিপ্রতার সাথে এক সাইডে সরে গেলে কোপটা বাতাসে ভেসে শাহাবের এক সাইড দিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকলে শাহাব আরো ক্ষিপ্রতার সাথে ঐ ছিনতাইকারির হাতটা দুই হাত দিয়ে ধরে সজোরে একটা মোচড় দিল।

কট করে একটা শব্দ করে হাতের গোড়ার বলটা সকেট থেকে বেরিয়ে গেল। সুতায় বাধার মত করে হাতটা শরীর থেকে ঝুলতে থাকল। প্রচণ্ড ব্যথ্যায় ছিনতাইকারি আর্তনাদ করে উঠল। সহকারির সহায়তায় আহত ছিনতাইকারি ওখান থেকে পালিয়ে বাঁচল।

ঘটনাটা সারিকা মনে ইংরেজি একশন সিনেমার নায়ক জ্যাসন স্ট্যাথামের একশন বলেই মনে হয়েছিল। সারিকা মুগ্ধ হয়ে গেল।

সারিকার বাবা হারুনুর রশিদ একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। চক বাজারে তাঁর বিশাল প্লাস্টিক সামগ্রীর পাইকারি দোকান। তাঁর নিত্য ব্যবহার্য্য সব রকমের গৃহস্থালী থার্মোপ্লাস্টিক বা থার্মোসেটিং প্লাস্টিকের দ্রবাদির বিশাল সংগ্রহ।

ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশ জুড়ে তার ব্যবসা। হারুন সাহেবের স্ত্রী শবনম ঢাকার মেয়ে তবে ঢাকাইয়া নন। স্ত্রীর চাপেই তিনি ধানমন্ডির বাসিন্দা হয়ে যান। হারুন সাহেবের এক ছেলে আর এক মেয়ে। ছেলে আনাম বোন সারিকার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়।

বয়সের এই বিস্তর ফারাক ভাই-বোনের মধুর সম্পর্কটাকে একটুও কমাতে পারে নাই। বোন সারিকা এখন ইডেন মহাবিদ্যালয়ে পড়ছে আর ভাই আনাম কোন মতে স্নাতক করেই বাপের সাথে ব্যবসায় লেগে গিয়েছে। চাক বাজার যাওযা আসার সুবিধার জন্য আনাম একটি নীল রঙ-এর সুজুকি জিক্সার এফআই এবিএস মটরসাইকেল কিনে নিয়েছিল।

আজ প্রায় দুই বছর হল আনাম বাপের সাথে ব্যবসায় যোগ দিয়েছে। বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা ছেড়ে প্রতিদিনই রাস্তার জ্যাম ভেঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা লাগিয়ে সেই পুরাণ ঢাকায় যাওয়া তার কাছে আস্তে আস্তে বিরক্তিকর হয়ে উঠল। প্রায়ই কোন না কোন ছুতায় দোকানে যাওয়ায় ফাঁকি দেওয়া শুরু করল। একদিন প্রচণ্ড বুকে ব্যথা বলে কাজে না যাবার কথা জানালো।
“বাবা আনাম তুই কাজে যাবি না কেন?”
“মা, আমার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা করছে।”

বুকে ব্যথা শুনে মা শবনম উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। প্রথমে মনে করলেন যে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। তবে আনামের বুকের ব্যথার রকম দেখে তাঁর যথেষ্ট সন্দেহ হল। তিনি জানেন যে ঢাকার প্রায় সব মহল্লার কোন না কোন ডিসপেন্সারিতে ডাক্তার বসেন। তাড়াতাড়ি জন্য ছেলেকে নিয়ে কাছেই একটা ডিসপেন্সারিতে গেলেন।

ঐ ডিসপেন্সারিতে তখন বাংলাদেশ মেডিকাল কলেজ থেকে সদ্য পাশ কার ডা. নিশাত ইব্রাহিম বসতেন। নিশাত এমনিতেই মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। তবে মেডিকাল ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা মেডিকালে ভর্র্তি সুযোগ না পেয়ে পেয়েছিল চিটাগাং মেডিকালে। নিশাত বা ওর বাড়ি থেকে কারো ঢাকার বাইরে যেয়ে পড়াশানো করার পক্ষপাতি ছিল না। তাই নিশাত ঢাকার প্রথম সারির প্রাইভেট মেডিকাল কলেজ বাংলাদেশ মেডিকাল কলেজে ভর্তি হয়েছিল। নিশাত ভাল ভাবেই ডাক্তারি পরীক্ষায় পাশ করে, ইন্টার্নিশীপ শেষ করে বিএমডিসির রেজিস্ট্রেশন পেয়ে যায়। নিশাতের ইচ্ছা ছিল বিসিএস করবার। তাই সে কোন রকমের চাকরিতে যোগদান না করে, বাপের হোটেলে খেয়ে মহল্লার ডিসপেন্সারিতে বসে রোগী দেখা শুরু করেছিল। মহল্লার ডিসপেন্সারিতে রোগী কম আসে আর যারাও বা আসে তারাও বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ। কম রোগী আসার কারণে নিশাত তার বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পড়াশানো করবার বেশ সময় পায়। আট দশজন যা রোগী আসে তাতে নিশাতের হাত খরচসহ টুকটাক নিজস্ব প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র কিনবার টাকা উঠেও বেঁচে যায়। তাই নিশাত মাঝে মাঝে বাসার সবার জন্য টুকটাক উপহার কিনে দেয়।
নিশাতের বাবা একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত সিনিয়ার আইনজীবী। তিনি হাইকোর্ট আর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। তিনি বেশির ভাগই করপোরেট মামলা করেন। বেশ কয়েকটি বড় বড় শিল্প গোষ্ঠির রেটেইনড আইনজীবী। মামলা থাকুক আর না থাকুক রিটেইন্ড আইনজীবী হওয়াতে তিনি প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট ভাতা পান। এছাড়া মামলা হলে তার ধারা আর ধরণ অনুযায়ী আলাদা ভাবে ফি পান। আইন পেশায় থেকে তিনি গাড়ি বাড়ি সবই করেছেন। তিনি ধানমন্ডির তিন নম্বর সড়কে দক্ষিণ-পশ্চিম কোনার একটা পাঁচ কাঠা প্লট কিনেছিলেন। ঐ প্লটে একটা দক্ষিণমুখী তিনতলা বাড়ি করেছিলেন। দোতলা আর তিনতলার দক্ষিণদিকের পুরা ওয়ালটা ১২ মিলিমিটার পুরু হালকা টিন্টেড তাপ প্রতিরোধক কাঁচের। বাড়ির বাইরের দিকের সব জানালাই কপার কালারের এ্যনোডাইজড এ্যলোমিনিয়ামের ফ্রেমে মোড়া একই রকমের কাঁচের। তাপ প্রতিরোধক কাঁচ হওয়াতে সূর্যের তাপ ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। পুরা প্লটটা ছয় ফিট উচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্লটের অর্ধেকটা জুড়ে সুন্দর বাগান করা। বাগানে সিজন অনুযায়ী বিভিন্ন ফুলের গাছ লাগান হয়। কাছের এক নার্সারী থেকে এক মালি এসে নিয়মিতভাবে বাগানের পরিচর্যা করে যায়। বিল্ডিং-এর এক সাইডে একটা গাড়ির গ্যারাজ। নিচের তলায় তাঁর চেম্বার, দোতলায় একটা বিশাল ড্রইং রুম, সংলগ্ন বাথরুমসহ গেস্ট রুম, কিচেন, ডাইনিং স্পেস, বাথরুমসহ সার্ভেন্ট রুম, স্টোর রুম ইত্যাদি। তিনতলা বিশাল মাস্টার বেড রুম, হাফিজ আর নিশাতের দুটা রুম, একটা বেশ বড় সাইজের ফ্যামিলি রুম। উনার বড় ছেলে, হাফিজ এমবিবিএস পাশ করে ইংল্যান্ডে যেয়ে ওখানকার পরীক্ষায় পাশ করে লন্ডনে ডাক্তারি করছেন। লন্ডনে উনি এক ইরানী মহিলাকে বিয়ে করে ওখানেই স্থায়ী হয়ে গিয়েছেন।
প্রত্যেক দিনের মত সেদিনও নিশাত সকালে গোসল সেরে নাস্তা করে চেম্বারে বসে একটা কারেন্ট এ্যাফেয়ার্সের বই পড়ছিল। সেই সময়ে এক মধ্য বয়সী মহিলা এক যুবককে নিয়ে স্বাভাবিকভাবে হেটে চেম্বারে এলেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে মা আর ছেলে। নিশাত একটু হেসে জিজ্ঞাসা করলো
“আপনাদের ভেতরে কে রোগী?”
“দেখ মা, আজ সকাল থেকে আমার ছেলে আনামের বুকে ব্যথা করছে।”
“আনাম সাহেব আপনি পাশের আমার ডায়াগনস্টিক বেডে শুয়ে পরুন। আমি দেখছি।”

নিশাত যুবকটিকে এতক্ষণ পর একটু ভাল করে খেয়াল করতে শুরু করল। যুবকটি সাধারণ বাঙালি ছেলেদের চেয়ে একটু বেশিই লম্বা। পাঁচ ফিট দাশ বা এগারো ইঞ্চি লম্বা হবে। তবে লম্বা অনুযায়ী চওড়া না হওয়াতে তাকে একটু পাতলাই মনে হয়। পুরা শরীরে কোন চর্বি নেই, পুরা শরীরটাই মাসল আর মাসল। ঋজু আর পেটা শরীর। পরনে একটা কালো গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট। তবে আজকালকার মত চিপা নয় একটু ঢিলাই। গায়ে একটা কালো টি-শার্ট। টি-শার্টের বুকে বড় অক্ষরে মভ কালারে ‘লাভ’ লেখা । বেশ রোমান্টিক বটে। বাহুর খোলা আংশটা হালকা কালো পাতলা আর সিল্কি লোমে ঢাকা। টি-শার্টের গোল বদ্ধ গলাা জন্য বুকটা দেখা যায় না। তবে নিশাত আন্দাজ করতে পেরেছিল যে হয়ত যুবটি বুকে আর পায়ে বাহুর মতই লোমে ঢাকা থাকবে। এই রকম লোমশ আর পুরুষাল যুবক যে কোন মেয়েকেই ভাল ভাবেই আকর্ষণ করতে পারে। আনাম সামান্য হলেও নিশাতকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। যুবকটির পায়ে এক জোড়া কেডস। তবে কেডসটা বহুল ব্যবহৃত বলে কোন ব্যান্ডের তা বোঝা যাচ্ছিল না। তবে দামি কোন ব্র্যান্ডের হবে সেটা বোঝা যাচ্ছিল। ছেলেটার গায়ের রং ফর্সার দিকে তবে ফর্স বলা যাবে না। মুখটা একটু লম্বাটে। চেহারাটা ভীষভাবে পুরুষাল আর একটা রুক্ষ ভাব আছে। চুলটা মনে হয় কম পক্ষে দুই মাস কাটায় না। বোধ হয় দুই দিন ধরে শেভ করে না। সারা গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর গোঁফ। নাকটা মানানসই ভাবে খাঁড়া। চোখ দুটা আর সবার মতই, অতি সাধারণ। ঠোঁট দুটা ছেলেদের মতই একটু ভারি আর বিস্তৃতিও একটু বেশি। আজকালকার ইয়ং ছেলেদের মত হাতে কোন ঘড়ি নেই। যুবকটির আঙ্গুলে কোন আংটি নেই। তার মানে অবিবাহিত।
নিশাত এবারে মহিলাটিকে লক্ষ্য করতে শুরু করল। মহিলাটিও ছেলের মতই সাধারণ বাঙালি মেয়েদের চেয়ে একটু বেশি লম্বা। মনে হয় পাঁট ফিট ছয় সাত ইঞ্চি লম্বা হবে। মহিলাটির সব চেয়ে আকর্ষণীয় হল তাঁর দেহসৌষ্ঠব। একদম বোম্বের নায়িকাদের মত বালু ঘড়ির জিরো ফিগার। পেটটা ঈর্ষনীয় ভাবে ফ্ল্যাট। শরীরে কোথাও এক বিন্দু পরিমনে চর্বি নেই। অত্যন্ত ফর্সা মহিলাটির চেহারাও ছেলের মত লম্বাটে তবে থুতনিটা একটু চোখা। ঘন কালো পাতলা আর সিল্কি চুলগুলো একটা ঢাউস খোপা করে মাথায় বাঁধা। খুব সম্ভবত চুলগুলা নিতম্ব পর্যন্ত লম্বা। এখানেই নিশাতের একটু কমতি আছে। ওর চুলগুলোও মহিলাটির চুলের মতই ঘন কালো পাতলা আর সিল্কি তবে ওর চুলগুলা উনার মত লম্বা না। নিশাতের চুলগুলো ওর পিঠ পর্যন্ত লম্বা। গোল গোল বড় বড় চোখ দুটিতে হরিণের চোখের মত বড় আর ঘন কালো মনি। নাকটা ছেলের নাকের মতই মানানসই ভাবে খাঁড়া। তবে ঠোঁট দুটা একটু টানা আর পাতলা তবে একটু বেশি গোলাপি। গালে রক্তের আধিক্যে জন্য টোপলা টোপলা গাল দুটাতে সব সময়ে একটু লালচে আভা থাকে। হাসলে মুক্তার মত ঝকঝকে দাঁতগুল্ ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে দেখা যায়। মহিলাটির লম্বা হাতের লম্বা পাঞ্জার আঙ্গুলগুলো শিল্পীদের আঙ্গুলের মত। আঙ্গুলের মাথার লম্বা লম্বা নখগুলো সুন্দর করে ম্যানিকিউর করা। দেখলেই বোঝা যায় যে নখগুলো ন্যাচারাল, কৃত্রিম নয়। নখগুলোতে ঠোঁটের সাথে ম্যাচ করে হালকা লাল নেইল পলিশ লাগান। মহিলাটির ডান হাতে এক ভরি করে দুটা সোনার চুড়ি আর বাঁ হতে মাইকেল করসের প্রায় দেড় ইঞ্চি ব্যাসের তিন কাটার এ্যানালগ ঘড়ি। ঘড়ির ডায়ালটি কালো। খাঁটি চামড়ার বেল্টটাও কালো। বাঁ হাতের অনামিকাতে একটা হোয়াইট গোল্ডের ভারি বিয়ের আংটি। মহিলাটির পরনে হালকা নীল জমিনের শাড়িতে আধুলী আর সিকি সাইজের লাল, সবুজ আর হলুদ ডট এলোমেলো করে প্রিন্ট করা। স্লীভলেস কালো ব্লাউজটা অত্যন্ত শালীন ভাবে বানান। স্তন বা ক্লিভেজ কিছ্ দৃশ্যমান নয়।
মনের অজান্তেই নিশাতের মনে মহিলাটির সাথে নিজের একটা তুলনায় চলে এলো। নিশাতের উচ্চতা সাধারন বাঙালি মেয়েদের মতই। তার ফিগারও বালু ঘড়িরর মত। তবে কোমরটা ঐ মহিলার মত এত চিকন না। মহিলাটি নিশাতের চেয়ে বেশি ফর্সা। মহিলাটি এই বয়সেও উনার ফিগার যে ভাবে ধরে রেখেছেন তাতে মনে হয় উনি আমার বয়সে অনেক যুবকের মাথা নষ্ট করে দিয়েছিলেন, ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন। নিশাত মনে মনে মহিলাটিকে ঈর্ষা করতে শুরু করে দিল আবার সেই সাথে মহিলাটিকে ভালও লেগে গেল। মহিলার ছেলেটিকেও তার মনে ধরে গেল।
আনাম জুতা খুলে বেডে শুয়ে পরলে নিশাত প্রথমে থেটোস্কোপ দিয়ে বুক পরীক্ষ শুরু করল। ডাক্তারি পড়াকালীন সময়ে বা তার পরেও নিশাত অনেকের বুক পরীক্ষা করেছিল। ডাক্তার হিসাবে রোগী দেখেছে কোন দিনই কোন রকম অনুভূতির জন্ম হয় নাই। কিন্তু আজ কেন যেন নিশাতের হৃদস্পন্দনটা মনে হয় একটু বেড়ে গিযেছিল। নিশাত মনে একটা অদ্ভুত উপলব্ধির উপস্থিতি অনুভব করতে শুরু করল। ভাল ভাবে সব কিছু পরীক্ষা করে একটু হেসে নিশাত আনামকে জিজ্ঞাসা করলো,
“আনাম সাহেব আপনি কি করনে?”
আনাম উত্তর দেবার আগেই মা শবনম বললেন,
“আনাম স্নাতক করে ওর বাপের সাথে ব্যবসা করছে। ওদের ব্যবসা পুরাণ ঢাকার চক বাজারে।”
“আন্টি, আনাম সাহেবের কিছুই হয় নাই। মনে হয় ধানমন্ডির বাসিন্দা হয়ে পুরাণ ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকায় যেয়ে ব্যবসা করা উনার পছন্দ হচ্ছে না। তাই আমার ধারনা যে উনি বুকের ব্যথার বাহানা করে চক বাজারে যেতে চাচ্ছেন না।”
ধরা পরে যেয়ে আনাম ডাক্তারের উপর ভীষণ ক্ষেপে গেল। রাগত স্বরে বললো,
“মা, উনার রোগ নিরুপনের ক্ষমতার উপর আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। চল আমরা স্কায়ার হাসপাতালে যাই।”
“দেখুন আমার মতামত গ্রহণ করা না করা আপনাদের ব্যাপার। তবে আমি নিশ্চিত যে আপনারা যেখানেই যান না কেন একই ফল পাবেন। আনাম সাহেব আপনি খামাখা আমার উপর রেগে যাচ্ছেন।”
মা, শবনমের কাছে নিশাতের মতটা খুবই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হল। উনারা আর স্কয়ার হাসপাতালে গেলেন না আর আনামও আর চক বাজারেও গেল না।
মা শবনমের নিশাতকে ভাল লেগে গিয়েছিল। তিনি নিশাতকে ভাল করে খেয়াল করতে থাকলেন। ছিপছপে গড়নের নিশাত বেশ ফর্সা, তাঁর নিজের চেয়েও ফর্সা। লম্বায় আর সব সাধারণ বাঙালি মেয়েদের মতই, পাঁচ ফিট তিন চার ইঞ্চি হবে। মেয়েটার মুখটা বেশ গোলাকার। চোখদুটা একদম হরিণ টানা চোখ। চোখের মনি দুটাও হরিণের চোখের মত ঘন কালো আর বড় বড়। আই লাইনার দিয়ে আরো আকর্ষণীয় করে রেখেছে। চোখের পাপড়িগুলো লম্বা, চুলের মতই কালো তবে বেশ পাতলা। জোড়া ভ্রূ। ভ্রূর মাঝখানে একটা ছোট্ট কালো টিপ। ভ্রূগুলো চোখের পাপড়ির মতই পাতলা আর ঘন কালো। খাঁড়া পাতলা নাক। বাঁ নাকে ছোট্ট একটা ডায়মন্ডের নাকফুল লাগান। ঠোঁটটা ইষৎ ভারি আর একটু টানা। ঝকঝকে মুক্তার মত দাঁত। বাঁ দিকে একটা গজদন্ত। চেহারার ভেতরে একটা শান্ত আর সরলতার ছাপ। নিশাতের পরনে ছিল একটা হালকা নীল জমিনের উপরে ছোট ছোট গাঢ় নীল আর হলুদ প্রিন্টেড ফুল। শাড়িটা খুব সম্ভবত রাজশহী সিল্কের। সাথে ম্যাচিং ছোট্ট স্লিভের ব্লাউজ। শাড়ি দিয়ে ভালভাবেই বুকটা ঢাকা ছিল। পোশাকে একটা শালীনতার, একটা আভিজাত্যের ছাপ আছে। মেয়েটার বোধ হয় সকাল সকাল গোসলের অভ্যাস আছে। মেয়েটার পিঠ পর্যন্ত লম্বা চুলগুলো এখনও ভেজা। এর পর থেকে যে কোন ডাক্তারি সমস্যা হলে উনি নিশাতের কাছেই যাওয়া শুরু করলেন। তিনি মনে মনে নিশাতকে পুত্রবধু হিসাবে কল্পনা করতে শুরু করলেন। মা শবনম মেয়ে সারিকাকে নিশাতের কথা বললেন। সারিকাও নিশাতকে দেখবার জন্য উৎসাহী হয়ে উঠল। একদিন সারিকার সামান্য একটা মেয়েলি অসুস্থতার জন্য মা শবনম মেয়েকে নিয়ে নিশাতের চেম্বারে হাজির হলেন। নিশাত তার বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পড়াশোনা করছিল। শবনমকে দেখে নিশাত এক গাল হাসি নিয়ে বললো,
“আন্টি, ভাল থাকলে তো কেউই ডাক্তারের কাছে আসে না। তাই কেমন আছেন সেটা আর জিজ্ঞাসা করলাম না। সাথে নিশ্চয়ই আপনার মেয়ে। তা সমস্যাটা কার?”
“মা নিশাত তুমি একটু ভুল বলেছ। সামাজিকতার জন্য হলেও মানুষ ডাক্তারের কাছে যায় তবে সেটা তার বাসায়, চেম্বারে নয়। তুমি ঠিকই ধরেছ, সাথে আমার মেয়ে সারিকা। কলেজে পড়ছে। ওর একটু সমস্য আছে।”

ডা. নিশাত সারিকাকে ভাল ভাবে পরীক্ষা করে একটু গম্ভীর হয়ে গেল। এই রকম সামান্য অসুস্থতার জন্য কেউ ডাক্তারের কাছে আসে না বা আসবার প্রয়োজনও পরে না। অর্থাৎ ভাই-এর মত একটা ভুয়া করণে এসছে। নিশাতের কেন যেন একটু সন্দেহ হল যে উনারা হয়ত তাকে নিয়ে কিছু একটা ভাবছেন। অবশ্য ভাবতে তো দোষের কিছু নেই। এর ভেতরে তো বেশ কয়েকটি বিয়ের প্রস্তাবও এসেছিল। সব প্রস্তাবই বিসিএস পরীক্ষার কথা বলে এড়িয়ে গিয়েছিল। নিশাত জীবনে পচিশ বসন্ত পাড় করে এসছে। এতদিন তো পাড়ার কত ছেলের সাথে, ভাই হাফিজের কত বন্ধুর সাথে, কলেজে কত ছেলে সহপাঠীর সাথে মেলামেশা করেছিল। কিন্তু কোন দিনই তো কোন ছেলেকে মনে ধরে নাই। তার কল্পনার পুরুষ মানুষটি ছিল লম্বা-চওড়া, কঠিন আর ভীষণ পুরুষাল। আনাম সব দিক দিয়েই ঠিকই ছিল একমাত্র কমতি ছিল যেটা সেটা হল আনাম লম্বা ছিল আশামত তবে চওড়ায় আশামত ছিল না। যাক সব সময়েই তো সব কিছু আশামত হয় না। তাই আগেই ক্রাশ খাওয়া আনামদের তরফ থেকে একটা প্রস্তাব মনে মনে আশা করে একটু শিহরিত হয়ে উঠল। আনামের বোন সারিকাকেও ভাল লেগে গেল।

কয়েকদিন পর শবনম সত্যি সত্যিই আনামকে নিশাতের কথা বললেন। আনাম নিশাতের কথা শুনেই তেলে বেগুনে জ¦লে উঠল।
“মা, তোমার কি মাথা খরাপ হয়ে গেছে? ঐ গবেট ডাক্তারকে বিয়ে করতে বলছ?”
“বাবা তুই নিশাতের ওপরে এত রেগে আছিস কেন? সেদিন তোর মিথ্যাটা ধরে ফেলেছিল বলে? তোর বুকের ব্যথাটা যে ভাওতা ছিল সেটা আসি প্রথমেই সন্দেহ করেছিলাম। তোর ঐ গবেট ডাক্তারকে কিন্তু আমাদের ভীষণ পছন্দ হয়েছে। আমি বলছি তুই ওকে বিয়ে করলে সুখি হবি।” “আমাদের মানে কি ? আব্বুও কি ঐ ভুয়া ডাক্তারকে দেখেছেন?”
“না তোর বাবা দেখেন নাই তবে সারিকা দেখেছে। সারকিারও ভীষন পছন্দ হয়েছে।”
“মা বিয়ে করলে আমি সুখি হব নাকি দুঃখী হব সেটা তুমি কি করে বুঝলে।”
“দেখ বাবা ছেলে বা মেয়েরা কিসে সুখি হবে সেটা অনেক বাবা মা’রা বুঝতে পারে।”
“মা, তুমি তো জান যে আমি তোমার কথা ফেলতে পারব না। ঐ ভুয়া আর ফালতু ডাক্তার কিন্তু আমার কোন চিকিৎসা করতে পারবে না।”
“ঠিক আছে ভাইয়া। ভাবী তোকে ছাড়া আমাদের তিনজনকেই দেখবে।”
আনাম স্নেহের সাথে বোনের চুল হালকা করে মুঠি ধরে বললো,
“এই ফাজিল, ঐ ভুয়া ডাক্তার তোর ভাবী হল কি ভাবে?”
“কেন? ভাই-এর বৌ তো ভাবীই হয়।”
“আমার মাথা খারাপ না পেট খারাপ যে ঐ গবেটটাকে আমি বিয়ে করব। তোর আর কোন ভাই থাকলে তার সাথে বিয়ে দিয়ে গবেটটাকে ভাবী বানাস।”
“ভাইয়া, নিশাত কিন্তু সব দিক দিয়েই খুবই গ্রহণযোগ্য। নইলে কিন্তু তুই পস্তাবি।”
“তোরা দিবাস্বপ্ন দেখতে থাক। আমি চললাম। আমার কাজ আছে।”
আনাম আসর থেকে উঠে এলো ঠিকই, তবে মা আর বোনের কথায় আবার নিশাতের প্রতি একটু হলেও আগ্রহ জন্মাল। আগ্রহটাকে উপেক্ষা করে কাজের উদ্দেশ্যে চক বাজার চলে গেল। কিন্তু কেন যেন কাজের ফাকে একটু আবসর হলেই নিশাতের কথা মনে চলে আসতে শুরু করল, নিশাতের মুখটা মনে ভেষে উঠতে থাকল। আনাম জানে যে নিশাত রাত ন’টা বা দশটা পর্যন্ত ডিসপেন্সারিতে থাকে। কোন এক অমোঘ আকর্ষণে আনাম ন’টার আগেই নিশাতের ডিসপেন্সারির উল্টা দিকে বাইক স্ট্যান্ড করিয়ে অপক্ষো করতে শুরু করল। প্রথমদিন থেকেই নিশাত রিক্সা ডাকতে যেয়ে উল্টা দিকে আনামকে বাইকে বসে থাকতে দেখতে পেত। নিশাত মনে মনে একটু খুশি হয়েছিল তবে কোন রকম যোগাযোগ করবার চেষ্টা করে নাই। নিশাত নিশ্চিত ছিল যে আনাম নিজেই এসে ধরা দেবে। নিশাতের ভাবনাটা ঠিকই ছিল।

আনাম দু দিন নিশাতের চিন্তাটা মন থেকে জোড় করে দূরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু তৃতীয় দিনে আর পারল না। সকাল দশটার দিকে নিশাতের ডিসপেন্সারিতে হাজির হল। আজ নিশাত গাঢ় সবুজ রঙ-এর পাপিং করা হালকা ঘিয়া রঙ-এর ফ্রি ফিটিং কামিজ আর তার সাথে একই রঙ-এর স্লিম পাজাম পড়ে এসেছিল। সবুজ রঙ-এর ওড়নাটা আজকালকার মেয়েদের মত গলায় ঝুলছিল। ফ্রি ফিটিং কামিজ হওয়াতে আসালীন মনে হচ্ছিল না। আনাম প্রথম যে দিন নিশাতের কাছে এসেছিল, সেদিন তার মেজাজটা একটু খারাপ ছিল, তাই নিশাতকে ভাল করে লক্ষ্য করে নাই।

আজকে নিশাতকে ভাল করে দেখে তার মনে ধরে গেল। নিশাতও তার ক্রাশ খাওয়া মানুষটাকে সামনে পেয়ে উচ্ছ্বিত হয়ে উঠল। তবে মনে ভাব চেপে রেখে একটা মন ভোলান হাসি দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আনাম সাহেব, আজও কি চক বাজারে যেতে ইচ্ছা করছে না। আজও কি বুকে ব্যথা করছে? রেস্টের উপদেশ কি লিখে দেব?”“মিস নিশাত, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আজ আর চকে যেতে ইচ্ছা করছে না। অবশ্য তার জন্য কোন উপদেশ লাগবে না।” “তবে কিসের জন্য একজন ডাক্তারের কাছে এসেছেন। মানুষ ডাক্তারের কাছে আসে কোন না কোন সমস্যা নিয়ে।” ধরা পরে যেয়ে এবং কোন যথাযথ কারণ ছাড়া ডাক্তারের কাছে আসবার কোন উপযুক্ত কোন উত্তর না থাকায় আনাম একটু নার্ভাস বোধ করতে শুরু করল, ঘেমে উঠতে শুরু করল। কোন মতে বললো, “মিস নিশাত, একটু চা খাওয়ান?” 

“আমি খুশি মনে আপনাকে চা খাওয়াতে পারি। তবে আমার সময় নষ্ট করবার জন্য আমার কনসাল্টেশন ফি দিতে হবে।” 

“আপনার মত আমিও খুশি মনে আপনার কনসাল্টেশন ফি দেব। কোথায় কি ভাবে দেব আমাকে জানাবেন।” 

“আপনাকে জানাতে হলে তো আপনার ফোন নম্বর জানা দরকার। ফোন নম্বরটা দেবেন?”

 “আপনার ফোনটা দিন। আমি একটা কল করছি। তাতে আমরা দুজনাই দুজনার ফোন নম্বর পেয়ে যাব। আমার নম্বরটা কি নামে সেভ করবেন?” 

“ফাকিবাজ।”

 “বুঝেছি। কাজে ফাকি দেবার জন্য বুকের ব্যথার ভান করে আপনার কাছে এসেছিলাম। তাই না?”

 “ঠিক তাই। আমার নম্বরটা কি নামে সেভ করবেন?” 

“ভুয়া।”  “কেন আমাকে এই মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন? আর রং চা খাবেন না কি দুধ চা খাবেন।” “আমার মতে চায়ে দুধ দিলে চায়ের আসল স্বাদটাই চলে যায়। তাই আমাকে রং চাই দেবেন।”

আনাম খুব যত্ন করে ভুয়া নামকরণের কারণটা এড়িয়ে গেল। নিশাত ডিসপেন্সারির ছেলেটাকে দিয়ে দুটা পেস্ট্রি আর রং চা আনিয়ে নিল। চা খেয়ে আরো কিছু আলাপ করে আনাম নিশাতের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলো। আজ আনাম খুব খুশি। খুশী মনে চকে যেয়ে দোকানে বসলো। রাতে বাড়ি ফিরবার সময়ে চক বাজারের আমানিয়া হোটেল থেকে চারজনের জন্য কাচ্চি বিরানি নিয়ে এলো। হঠাৎ করে কাচ্চি নিয়ে আসবার জন্য মা খুশি হলেন। তবে সারিকা একটা রহস্যের আভাস পেল। “ভাইয়া তুই তো কোন দিনই দশ টাকার বাদামও আনিস নাই। আর আজ হঠাৎ একেবারে কাচ্চি। রহস্যটা কি?”“বাসার জন্য কিছু আনলেই কি একটা রহস্য থাকতে হবে? মনে চাইল তাই আনলাম। তোর আপত্তি থাকলে খাস না।” রাতে সবাই খুব মজা করে কাচ্চি দিয়ে ডিনার করল। পুরাণ ঢাকার এই রকম মজার মজার খাবার মাঝে মাঝে আনবার জন্য সারিকা আবদারও করল। আনামও খুশি মনে রাজি হয়ে গেল।দুই তিন দিন গেল। দুজনই আবার দেখা করবার জন্য উৎসাহী হয়ে উঠল। আনামের কাছে কনসাল্টেশন ফি হিসাবে চা পাওনা আছে। সেই ছুতায় নিশাত আনামকে ফোন দিল। ফোনে ‘ভুয়া’ দেখে আনাম খুশি হয়ে দ্বিতীয় রিং হবার আগেই ফোন ধরল।   “ফাকিবাজ বলছেন?”“দেখুন মিস আপনি কিন্তু জেনেশুনেই ঠিক নম্বরে ফোন দিয়েছেন, তাই আর জিজ্ঞাসা করছেন কেন? তা আমি আজ আবার কি ফাকি দিলাম।”“আনাম সাহেব আপনি পিছলিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন কেন।”“কেন আমি আবার কি করলাম?”“আমাকে চা খাওয়াবার কথা দিয়ে এখন আবার ফাকি দেবার চেষ্টা করছেন।”  “মিস নিশাত, আমি দুঃখিত যে আমি আগে যোগাযোগ করি নাই। আসলে আগ বাড়িয়ে আপনাকে ফোন করলে আপনি যদি আবার কিছু মনে করেন সেই ভয়েই আমি আর যোগাযোগ করি নাই। আপনাকে চা খাওয়াতে যেয়ে বেশ কিছুক্ষণ সময় আপনার সঙ্গ পাব সেটাই হবে আমার অনেক বড় পাওনা। পরশুদিন বিকেলে রেডি থাকবেন আমি এসে আপনাকে উঠিয়ে নিয়ে যাব।”ঢাকায় প্রচুর অত্যাধুনিক কফিবার বা হাইফাই রেস্টুরেন্ট আছে তাই আনাম খুব চিন্তায় পরে গেল নিশাতকে কোথায় নিয়ে যাওয়া যাবে। শেষমেষ আনাম একটা জায়গা মনে মনে ঠিক করল। সময়মত আনাম নিশাতের ডিসপেন্সারিতে চলে এলো। “চলুন, মিস নিশাত ।”“আমার কোথায় যাচ্ছি সেটা কি জানা যাবে?”“নিশ্চয়ই জানতে পাবরেন। ঢাকাতে খুব আকর্ষনীয় একজন মহিলাকে নিয়ে চা খাবার অনেক ভাল জায়গা আছে। তবে আমার আজ চা খাব না। আইসক্রিমে আপত্তি আছে?”“না, আইসক্রিমে আপত্তি নেই। আমরা কোন আইক্রিম পারলারে যচ্ছি জানা যাবে?”“ঢাকায় বেশ অনেক আইসক্রিম পারলার আছে। গুলশান দুই-এ সুইস আইসক্রিম পারলার ‘মুভএন্ডপেক’, বনানী এগারতে ইটালিয়ান আইসক্রিম পারলার ‘ক্লাব জিলাটো’ ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটা ভাল আইসক্রিম পারলার আছে। তবে সন্ধ্যার পরে ঐসব জায়গায় বসবার জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। আমরা যাচ্ছি ক্লাব জিলাটো-তে। চলুন যাওয়া যাক।”     “এখান থেকে বনানী তো অনেক দূরে। আমরা কি ভাবে যাব?”   “মিস নিশাত, আমি থাকতে কোন চিন্তা নেই। বাইকে যেতে আপনার আপত্তি আছে।”“বাইকে আমি কোন দিন চড়ি নাই। বাইকের চাকায় ওড়না বা কামিজের এক অংশ পেঁচিয়ে যাবার ভয় আছে। তাই বাইকে যেতে আমার আপত্তি আছে।”  নিশাত দেখল যে ওর ডিসপেন্সারির সামনে একটা বিশাল আকৃতির নীল রঙ-এর সুজুকি মটর সাইকেল স্ট্যন্ড করা আছে। বাইকে অবশ্য শাড়ি গার্ড লাগান আছে। অবশ্য আজকাল বিশেষ করে যুবতী মেয়েরা সালোয়ার কামিজ বা জিন্স ও টি-শার্ট পড়ে বাইকে চড়ে। নিশাতের আপত্তির মুখে ওদের বাইকে যাওয়া বাতিল হয়ে গেল। আনাম হাতের ইশারায় একটা বেবিট্যাক্সি থামিয়ে দুজনে উঠে পরল। যেতে যেতে ওরা টুকটাক গল্প করছিল।“আনাম সহেব, ঢাকায় যে এতো আইসক্রিম পারলাম আছে তা তো জানতাম না। ঢাকা তথা দেশে আইসক্রিম শিল্পের আরম্ভটা হয় কি ভবে?”“ঢাকায় আইসক্রিম শিল্পের সূচনা হয় বেবি আইসক্রিমের মাধ্যমে। বেবি আইসক্রিমই সর্বপ্রথম ঢাকায় আইসক্রিম পারলারের প্রচলন করে, এর পরে আসে আপনার নভেল আইসক্রিম পারলার। মিস নিশাত আপনি কি বেবি আইসক্রিমের মালিকপক্ষ সম্বন্ধে কিছু জানেন?” “দেখুন আনাম সাহেব আমি খুব একটা মিষ্টি জাতীয় কিছু খাই না। আবশ্য মাঝে মাঝে আইসক্রিম খাই। মালিকপক্ষ কে কি বা তার পরিচয় এ সব সম্বন্ধে আমার কোন কালে আগ্রহ ছিল না। তাই তাদের সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।”“মিস নিশাত আপনি মিষ্টি জাতীয় কিছু খান না, মানে আপনি ভীষণভাবে ফিগার সচেতন। পাছে মুটিয়ে যাবেন এই ভয়ে মিষ্টি জাতীয় কিছু খান না। আপনি জানেন না আপনি কি মিস করছেন।”“দেখুন আনাম সাহেব আমি কি মিস করছি তা জানবার আমার কোন আগ্রহ নেই। এবারে বলুন দেখি আপনার বেবি আইসক্রিমের ইতিহাস।” “চলচিত্র নির্মাতা জহির রায়হান পাকিস্তানের প্রথম রঙ্গীন সিনেমা ‘সঙ্গম’ নির্মান করেন। এই সিনেমায় ‘হারুন’ নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। নায়ক হারুনের বাবা ছিলেন একজন শিল্পপতি। তিনি ১৯৫০ সালের শেষের দিকে আজিমপুর কলোনিতে ‘বেবি আইসক্রিম’ ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করেন। বেবি আইসক্রিমই ঢাকায় প্রথম কৌনিক, বর্গাকার এবং গোলাকারের মত বিভিন্ন আকারের আকর্ষণীয় প্যাকেজিং মাধ্যমে আইসক্রিম বাজারজাত করে। ঢাকায় প্রথম দিকে তারা পাড়ায় পাড়ায়, স্কুল গেটের সামনে বা রাস্তায় রাস্তায় ভেন্ডারের মাধ্যমে আইসক্রিম বিক্রি করতেন। সেই সময়ে বহনযোগ্য ফোম লাইনিং করা কঠের বাক্সে আইসক্রিম ফেরি করে বিক্রি হত। এই বাক্সে আইসক্রিম সারা দিনই হিমায়িত থাকত ঠিকই তবে দিনের শেষের দিকে এগুলো গলে যেত। তখন আইসক্রিম ব্যবসা প্রধানত আগাখানি, গুজরাটি বা বোম্বাইয়া সম্প্রদায়ের লোকেরই পরিচালনা করত। ১৯৫০ সালের শেষের দিকে ততকালীন পাকিস্তান সরকার গুলিস্তান এলাকাটি অধিগ্রহণ করে সখানে একটি সিনেমা হল, একটি মার্কেট ও এলাকাটি বাণিজ্যি এলাকায় পরিনত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। খুব সম্ভবত ১৯৬০ সালের প্রথমদিকে বেবি আইসক্রিমই ঢাকার সর্বপ্রথম একটি পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত আইসক্রিম পারলার চালু করে। বেবি আইক্রিম পারলার পূর্ণাঙ্গ গুলিস্তান এলাকাটির একটি আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠল। টুকটাক গল্প করতে করতে ওরা বনানীর স্টার কাববের পেছনে ‘ক্লাব জিলাটো’-র সামনে এসে পৌঁছাল।আইসক্রিম পারলারটি খুব রুচিসম্মতভাবে সাজসজ্জা করা হয়েছে। পারলারটি সম্পূর্ণরূপে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। পেছনের কাউন্টারে দুটি সফ্ট আইসক্রিম, ফ্রোজেন ইয়োগার্ট মেশিন স্থাপিত আছে। প্রতিটি মেশিনে তিনটি করে নজ্ল আছে। একটা নজল দিয়ে ভ্যানিলা, আর একটা দিয়ে চকোলেট আর একটা নজল দিয়ে স্ট্রবেরি আইসক্রিম ওয়েফার কোনে আইসক্রিম দেওয়া হয়। এছাড়া আছে একটি তিন বউলের একটি স্লাশী মেশিন। এছাড়া স্থানীয়ভাবে তৈরি স্টেইনলেস ষ্টিলের বারো ট্রের আইসক্রিম ডিসপ্লে ইউনিটতে বারো স্বাদের আইসক্রিম রাখা আছে। যার যে স্বাদের পছন্দ সেইসব আইসক্রিম কোনে বা ছোট, মাঝাড়ি বা বড় পেপার কাপে আইক্রিম নিচ্ছে। এছাড়াও এখানে পাওয়া যায় বিভিন্ন স্বাদের ও বিভিন্ন ধরণের কেক বা পেস্ট্রি। এখনে সাধারণতঃ উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের ছেলেরা তাদের বান্ধবীদের বা সন্তানদের নিয়ে পরিবারও আসে। সন্ধ্যা থেকে রাত এগারটা বা বরোটা পর্যন্ত এইসব পারলার জমজমাট থাকে।একদম ভেতরের দিকে একটি বিশাল চকচকে কালো মার্বেলের কাউন্টার। কাউন্টারের সামনে, এই মাথা থেকে ঐ মাথা পর্যন্ত বেশ কয়েকটি উচু সিটিং টুল। সব কটা টুলেই বিভিন্ন বয়সের ছেলে আর মেয়ে বসে আইসক্রিম খাচ্ছিল। কাউন্টারের সামনে খালি ফ্লোরের একদিকে দুইজন বা চারজন বা আট-দশ জন বসবার নরমাল চেয়ার আর টেবিল। চেয়ারগুলো বেশ ভারি আর গদি দেওয়া। টেবিলগুলো দশ মিলিমিটার পুরু কাঁচ দিয়ে ঢাকা। টেবিল চেয়ার সবই কাঠের। ফারনিচার সবই চকচকে পলিশ করা। পারলারের অতিথিরা প্রায় সবাই উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলে বা মেয়ে। অতিথি সমাগম দেখে বোঝা যায় যে ঢাকায় পারলারটি বেশ জনপ্রিয়। পারলারের কাউন্টারের পেছনের আর ফ্লোরের বেশ কিছু কর্মচারি আনামকে বেশ সমিহ করল। দুজনার কোন টেবিল খালি না থাকাতে আনাম আর নিশাতকে একটা চারজনের টেবিল দিল। “আনাম সাহেব, এখানে বেশ অনেকেই দেখি আপনাকে চেনে আর বেশ খাতির করল। আপনি কি প্রায়ই এখানে আসেন।” “প্রায়ই না তবে মাঝে মাঝে আসি। আর ওয়েটারদের ভালই টিপস দেই বলে আমাকে খাতির করে।” “এখানে তো দেখছি সবাই তাদের বান্ধবীদের নিয়ে এসেছে। তা আনাম সাহেব আপনি এখানে কতবার কতজন বান্ধবীকে নিয়ে এসেছিলেন্।” “মিস নিশাত আপনি ঠিকই ধরেছেন এখানে প্রায় সবাই তাদের বান্ধবীদের নিয়ে এসেছে। আর কোন বান্ধবীকে নিয়ে এখানে আসবার আমার সেই রকম সৌভাগ্য এখন পর্যন্ত হয় নাই। কেননা আমার কোন বান্ধবী ছিল না বা নেইও।” আনামের কোন বান্ধবী নেই শুনে, নিশাত নিজেও জানে না কেন যেন ওর মনটা এক রকম প্রশান্তিতে ভরে গেল। “আপনার মত এজন আকর্ষণীয় যুবকের কোন বান্ধবী নেই কথাটা কেন যেন বিশ্বাস করতে একটু কষ্ট হচ্ছে।” “দেখুন মিস নিশাত কথাটা বিশ্বাস করা বা না করা আপনার ব্যাপার, তবে কথাটা সত্যি। আর আমি নিশ্চিত যে আপনার মত একজন বিদুষী, মেধাবী আর সুন্দরীর গুণগ্রাহীর অভাব নেই আর তাদের ভেতরে নিশ্চয়ই ভাগ্যবান বিশেষ কেউ একজন আছেন।” “আনাম সাহেব একজন সদ্য পরিচিতাকে সুন্দরী বলাটা কিন্তু শিষ্টতার ভেতরে পরে না।” “মিস নিশাত শিষ্টাচার বহির্ভূত কথা বলার জন্য আমি মোটেও দুঃখিত নই, কেননা আমি কোন মিথ্যা বলি নাই, কথাটা সত্যি।” নিশাত, বিশেষ করে মেডিকেলে পড়বার সময়ে অনেক ছেলে সহপাঠী পেয়েছিল। এটাও সত্যি যে তার অনেক সহপাঠী তার সাথে বিশেষ সম্পর্ক গড়বার চেষ্টা করেছিল। তবে তারা কেউই নিশাতের মনের চাহিদামত, আশামত বা মনের মত রাফ এন্ড টাফ পুরুষাল ছিল না। তবে অনেক লাল্টু মার্কা, মেয়েলি চেহারার ছেলে নিশাতের সাথে সম্পর্ক গড়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। তাই এতদিন আজ পর্যন্ত নিশাত বয়ফ্রেন্ডহীন ছিল। আনামকে মনে ধরলেও নিশাত এখন পর্যন্ত নিজেই নিশ্চিত নয়। তবে এটা ঠিক যে আনামের সঙ্গ নিশাতের ভাল লাগে, তার সঙ্গ কামনা করে। আনামকে একটু দোটানায় রেখে বা একটু অনিশ্চিতায় রেখে আনামের প্রতিক্রিয়াটা দেখবার লোভ সামলাতে পারল না। তাই নিজের যে কোন বয়ফ্রেন্ড নেই সেটা চেপে গেল। নিশাতের বয়ফ্রেন্ড আছি কিনা জানা গেল না, তবে আনাম আশাহত হলেও কিছু বুঝতে দিল না। “নিশাত, আইসক্রিম কোনে খাবেন নাকি কাপে খাবেন। অবশ্য কাপ ছোট, মাঝারি আর বড় এই তিন সাইজের হয়। তারপরে আছে ফ্লেভার পছন্দ করা। বারো ফ্লেভারে আসিক্রিম পাওয়া যায় – ভ্যানিলা, স্ট্রবেরি আর চকলেট, স্পিনাচ, বাটারস্কচ, ম্যাঙ্গো, বানানা ইত্যাদি।” নিশাত খেয়াল করল যে আনাম এবারে মিস নিশাত বলে নাই, সরাসরি নাম ধরে বলেছে। নিশাত মনে মনে একটু খুশি হলেও সেটা প্রকাশ করল না। নিশাত সরাসরি আনামের নাম ধরে বলতে যেয়েও লজ্জায় সে ভাবে বলতে পারল না। “আনাম সাহেব, কোনে আইসক্রিম খায় তো বাচ্চারা। আমাকে এ্কটা ছোট কাপে স্ট্রবেরি আইসক্রিম দিতে বলেন।” আনাম ওয়েটারকে ডেকে দুজনার জন্য মাঝারি সাইজের কাপে দুজনকে এক স্কুপ করে স্ট্রবেরি আর চকলেট আইসক্রিম দিতে বললো। “আনাম সাহেব আমি তো এক স্কুপ আইসক্রিম দিতে বলেছিলাম।” “নিশাত, ভয় নেই। দুই স্কুপ আইসক্রিম খেলে মুটিয়ে যাবেন না।” দুজনে গল্প করতে করতে আইসক্রিম খেতে থাকল। অনাম খেয়াল করল যে নিশাত খুব আগ্রহ আর উৎসাহ নিয়ে কোন রকম বিরূপ প্রতিক্রিয়া ছাড়াই আইসক্রিমের স্কুপ দুটা উপভোগ করল। “নিশাত আরো আইসক্রিম দিতে বলবো?” নিশাত লাজুক কন্ঠে আস্তে করে বললো, “বলুন, তবে এক স্কুপ।” আইসক্রিম খেতে খেতে তার নিজেদের বাবা, মা ভাই বা বোন কে কি করে সবই জেনে নিল। খাওয়া শেষ করে ওরা দুজনে আবার একটা বেবিট্যাক্সি করে ডিসপেন্সারিতে চলে এলো।কয়েক দিন গেল। কোন তরফ থেকে কোন রকমের যোগাযোগ হল না। তখনকার সময়ে সরাসরি কথা বলার চেয়ে ফোনে যোগাযোগ করা সহজ হলেও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক সঙ্কোচ কাটিয়ে কেউই উদ্যোগী হয়ে উঠতে পারে নাই। অবশেষে আনাম একদিন চক বাজারে যাবার আগে নিশাতের ডিসপেন্সারিতে এলো। সব সময়ের মতই নিশাত তখন তার বিসিএস পরীক্ষা প্রস্তুতির জন্য পড়াশোনা করছিল। আনামকে দেখে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো, “আনাম সাহেব, আজও কি চকে যেতে ইচ্ছা করছে না?” আনাম একটু নাটকীয় ভাবে পিঠের পেছনের হাতে ধরা লাল গোলাপ ফুলটা নিশাতকে দিয়ে একটু আবেগী কন্ঠে বললো, “নিশাত আপনি সঙ্গ দিলে আমি আজ আর চকে যাব না।” “আনাম সাহেব, আপনার অসম্ভব সুন্দর গোলাপের জন্য ধন্যবাদ। আপনি এখন চকে যাবেন আর আমিও একটু পড়াশোনা করব। তবে আপনাকে নিরাশ করব না। আজ সন্ধ্যায় আপনাকে সঙ্গ দেব।” “নিশাত গোলাপ ফুল দেবার মর্মার্থটা নিশ্চয় তোমার জানা আছে।” আনামের নিশাতকে নাম ধরে ডাকা আর একেবারে তুমি করে বলাটা নিশাতকে একবারে অভিভূত করে ফেললো। নিজের দুর্বলতাটা আর গোপন রাখতে পারল না। নিশাত নিঃশর্ত আত্মসমর্পন করল। “আনাম, আমি সেটা ঠিকই বুঝেছি। তুমি এখন চকে যাও। সন্ধ্যায় দেখা হবে।” দুজনা দুজনার কাছে প্রকাশ হয়ে পরল, তাদের ভেতরে আর কোন সঙ্কোচ রইল না।আজ প্রেমিক-প্রেমিকা হিসাবে আনামের সাথে প্রথম অভিসারে যাবে তাই নিশাত একটু উত্তেজিত ছিল। তাই একটু তাড়াতাড়ি লাঞ্চে বাসায় চলে এলো। মা’র মনে একটু প্রশ্ন এসে গেলেও কিছুই বললেন না। নিশাত লাঞ্চ সেরে আনামের সামনে নিজেকে আরো সুন্দরভাবে উপস্থাপন করবার জন্য সাজতে বসল। একটা কালে পাইপিং করা হালকা ক্রীম কালারের ফ্রি ফিটিং কামজি পরল। কামিজের ক্রিম কালারের জমিনের উপরে হালকা লাল, সবুজ আর হলুদ রঙ-এর বিভিন্ন আকার এবং আকৃতির ফুলের ছাপ। এর ভেতরে অবশ্যই লাল রংটা বেশি উজ্জ্বল আর সব চেয়ে বেশি দীপ্যমান। সাথে একটা সাদা স্লিম পাজামা পরল। কামিজের সামনের দিকের গলাটা উল্টা ত্রিভূজ আকৃতির। ত্রিভূজের নিচটা চোখা দিকটা স্তনের ঠিক বিভাজিকার পর্যন্ত টানা। গলার হালকা সোনার চেইন বিভাজিকার ভেতরে হারিয়ে গেছে তাই কোন লকেট আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। কামিজের পেছন দিকটা অবশ্য একটু বেশি নামান। পিঠের অনেক অংশই দৃশ্যমান থকে। ফর্সা পিঠে একটা বেশ বড় সাইজের কালো তিল জ্বলজ্বল করছে। পাজামার ঝুল পায়ের গোড়ালির একটু উপর পর্যন্ত। পাজামার নিচের দিকটা হালকা ফুল তোলা দুই ইঞ্চি চওড়া একটা লেসের। কামিজের লাল ফুলের সাথে ম্যাচ করে একটা লাল ওড়না গলায় ঝুলিয়ে নিল। ড্রেস ঠিক করে পরবার পরে মুখের দিকে নজর দিল। প্রথমেই মুখে একটা কুইক ফেসিয়াল লাগিয়ে মুখটাকে একটু উজ্জ্বল করে নিল। ইষৎ ভারি অথচ একটু টানা গোলাপি ঠোঁটে হালকা করে ম্যাকের ‘রুবি উ’ লিপস্টিক লগাল। নিশাতের চোখদুটা একদম হরিণ টানা চোখ। চোখের মনি দুটাও হরিণের চোখের মত ঘন কালো আর বড় বড়। টানাটানা চোখ দুটাতে গাঢ় করে আই লাইনার লাগিয়ে চোখ দুটাকে আরো মায়াবী করে নিল। আই ল্যাস লাগাতে যেয়েও কি যেন মনে করে আর আই ল্যাস লাগাল না। চোখের পাপড়িগুলো লম্বা, চুলের মতই কালো তবে বেশ পাতলা। জোড়া ভ্রূ। ভ্রূগুলো চোখের পাপড়ির মতই পাতলা আর ঘন কালো। খাঁড়া পাতলা নাক। বাঁ নাকে ছোট্ট একটা ডায়মন্ডের নাকফুল লাগান। ঝকঝকে মুক্তার মত দাঁত। বাঁ দিকে একটা গজদন্ত। নিশাত লিপস্টিকের সাথে ম্যাচ করে চোখে হালকা লাল আইশ্যডো লাগিয়ে নিল। এবারে চুল নিয়ে একটা দোটানায় পরে গেল। আনাম খোলা চুল পছন্দ করে নাকি খোপা করা চুল পছন্দ করে সেটা নিশাত জানে না। তাই মাঝামাঝি করে চুলগুলো ভাঁজ করে একটা পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে আটকিয়ে রাখল। এই হালকা সাজেই নিশাতকে অপূর্ব লাগছিল। নিশাত নিজের সাজে নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেল। নিশাত কিছুতেই এই সাজে মা’র বিস্ময়ভরা আর সন্দেহজনক চোখের সামনে দিয়ে বের হতে পারবে না। মা’র সাথে বিকেলের চা না খেয়েই টুপ করে বেরিয়ে গেল।

নিশাত দুরু দুরু বক্ষে ডিসপেন্সারিতে অপেক্ষা করতে থাকল। আনাম যথাসময়ে নিশাতের ডিসপেন্সারিতে এসে গেল। হালকা সাজের অপূর্ব নিশাতকে দেখে আনাম হা করে রইল। আনাম কিছু বলার আগেই নিশাত উঠে দাঁড়িয়ে বললো, 

“এই, হা করে কি দেখছ? মেয়েমানুষ কোন দিন দেখ নাই।” 

“প্রত্যেক দিনই মা আর বোনকে দেখছি, রাস্তাঘাটে অনেক মেয়েমানুষ দেখছি। কিন্তু আজকের নিশাতের মত আগে আর কাউকে দেখি নাই।” 

আরো বাংলা চটি

“অনেক হয়েছে, আর ফ্ল্যাটারি করতে হবে না। তুমি তো ভালই মেয়ে পটানো কথা বলতে পারো। কে জানে আগে এই একই কথা ক’জন মেয়েকে বলেছ? আনাম আজ আমাকে কাবাব-পরাটা খাওয়াবে। চল এবারে যাওয়া যাক।” 

একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে ওরা ধানমন্ডির দুই নম্বর সড়কে ‘স্টার কাবাব’-এ চলে এলো। আজ বেবিট্যাক্সিতে ওদের বসার একটু পরিবর্তন হল। প্রথমবার ওদের বসার ভেতরে একটু দূরত্ব ছিল আজ আর সেই দূরত্বটা রইল না। দুজনে গায়ে গা লাগিযে ঘন হয়ে বেবিট্যাক্সিতে বসল।

আনাম আর নিশাত যখন স্টার কাবাবে পৌঁছল, তখন মাগরীবের আজান হচ্ছিল। ‘স্টার কাবাব’ চার তলা নিজস্ব বিল্ডিং-এ পুরাটাই রেস্টুরেন্ট। এখানে কাবাব, পরাটা সহ, সকালের নাস্তা, দুপুরের খানা ও রাতের সব রকমের খাবার পাওয়া যায়। তবে কাবাবটা হয় শুধু মাত্র সন্ধ্যায়। সব ফ্লোরেই বসবার ব্যবস্থা আছে। সন্ধ্যার সময়ে বন্ধু-বান্ধব বা প্রেমিক-প্রেমিকা, বা পরিবার পরিজন দিয়ে একদম ঠাসা ছিল। তারা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও বসবার কোন জায়গা পেল না। রেস্টুরেন্টের লোকদের কাছ থেকে জানতে পারল যে রেস্টুরেন্টটি বিকেলের আগে মোটামুটি ফ্রি থাকে। 

“নিশাত এখন কি করবে? চল আজ ডিনার করে যাই। স্টারে আর একদিন সকাল সকাল আসা যাবে।” 

“আনাম, ডিনারে কি খাওয়াবে আর কোথায় খাওয়াবে?” 

“ঢাকার বিখ্যাত গ্রান্ড নওয়াবের কাচ্চি বিরিয়ানি খাবে?” 

“তা কোথায় তোমার ঐ বিখ্যাত গ্রান্ড নওয়াবের দোকান।” 

“বিখ্যাত গ্রান্ড নওয়াবের দোকানটা পুরান ঢাকার আবুল হাসনাত রোড, সাত রওজায়। বংশালের কাছে, যাবে?” 

“ওরে বাবা, সেই বংশাল! যেয়ে খেয়ে ফিরে আসতে কম পক্ষে চার ঘণ্টা লাগবে। তার মানে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা বেজে যাবে। একজন অবিবাহিতা মেয়ের পক্ষে অত রাত বাইরে থাকাটা কি পরিমান কেলেঙ্কারির জন্ম দিতে পারে তুমি কি বুঝতে পার ? ছেলেদের পক্ষে অত রাত বাইরে থাকা সম্ভব হলেও মেয়েদের পক্ষে সম্ভব না। আর তুমি যখন বলছ, তখন খানাটা নিশ্চয়ই ফাটাফাটি হবে। একদিন সময় নিয়ে দিনের বেলায় যাওয়া যাবে। দেখ, আবার পিছলে যেও না যেন।” 

“প্রমিজ, পিছলে যাব না। এখন কি করবে? বাসায় ফিরে যাবে ?” 

“ঠিক আছে আর একদিন না হয় আসা যাবে। তবে আজ এখনই ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না। চল কিছুক্ষণ রিক্সায় উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘুরে বেড়াই।”

দুজনার মনেই একই চিন্তা ছিল। রিক্সায় ঘন হয়ে বসে দুজনে দুজনার স্পর্শ অনুভব করা বা দুজনার গন্ধ অনুভব করা এ সব সুযোগ হাত ছাড়া করা একদম বোকামি হবে। ওরা একটা রিক্সা নিয়ে ধানমন্ডির রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেরাল। তখন সন্ধ্যার পর ধানমন্ডি এলাকাটা নির্জন হয়ে যেত, গাড়ি ঘোরাও খুব একটা চলত না। রিক্সায় উঠে দুজনই চুপচাপ দুজনার সঙ্গ উপভোগ করতে থাকল। কিছুক্ষণ পরে আনাম একটু সাহস করে নিশাতের একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে নিল। নিশাতের নরম তুলতুলে হাতটা নিয়ে আনাম খেলতে থাকল। নিশাতও আনামের শক্ত আর রুক্ষ হাতের খেলা উপভোগ করতে থাকল। আধা ঘণ্টা ঘোরার পরে ওরা স্টারে আবার একটা সুযোগ নেবার সিদ্ধান্ত নিল। ওরা আবার স্টারে ফিরে এলো। এবারে দোতলায় একটা সিট পেয়ে গেল। 

“নিশাত, এখানে চার-পাঁচ রকমের নান ও পরাটা পাওয়া যায়। এর ভেতরে একটা হল শাহী পরাটা। ওটা তেলে চুবিয়ে মচমচে করে ভাজা হয়, তাই স্বভাবিকভাবেই পরাটাটা হবে তৈলাক্ত। আর একটা হল কম বা হালকা তেলে ভাজা পরাটা। নানের ভেতরে আছে স্পেশাল নান, গার্লিক নান ইত্যাদি। আর কাবাবের ভেতরে আছে সাত/আট রকমের মাটন কাবাব, নয়/দশ প্রকারের চিকেন কাবাব, দুই রকমের বিফ কাবাব আর আছে ফিস কাবাব। কি খাবে বল?” 

“আনাম তুমি তো অন্ধকে হাতি দেখাচ্ছ। কাবাব যে এত রকমের হয় আমি আগে জানতামই না। তুমিই ঠিক করে অর্ডার দিয়ে দাও। তোমার সিলেকশনে আমি আস্থা রাখছি।” 

“নিশাত তুমি তো আবার ফিগার কনসাস। তাই আমি কম তেলে ভাজা পরাটা আর আমার পছন্দের বিফ শিক কাবাব দিতে বলি। সাথে কোল্ড ড্রিঙ্ক না বোরহানি খাবে?” 

“আনাম আমি আগে কোন দিন বোরহানি খাই নাই। তবে বিয়ে বাড়িতে বোরহানি দেখেছিলাম কিন্তু খাই নাই। আজ তোমার সাথে আমি প্রথমবারের মত বোরহানি খাব।” 

শাহাব মনে মনে বললো ‘নিশাত তুমি সারা জীবনই আমার উপরে আস্থা রাখতে পার’।

কিছুক্ষণের ভেতরে আনামের অর্ডার মোতাবেক রেস্টুরেন্টের এক ওয়েটার ওদের জন্য দুটা কোয়ার্টার প্লেটে রাইতাতে চুবান শষার স্লাইস আর পেয়াজ দিয়ে গেল। কিছুক্ষণের ভেতরেই দুটা ডিনার প্লেটে দুজনার জন্য দুটা করে পরাটা আর একটা করে কাবাব এলো। মোটা মোটা শিক কাবাবগুলো ছিল ডিনার প্লেটের এই মাথা থেকে ঐ মাথা পর্যন্ত লম্বা। পরাটাগুলো ছিল প্রায় তেলশূন্য। রেস্টুরেন্টের ওয়েটারগুলোর পরনে ছিল লাল রং-এর ফতুয়ার মত হাফ শার্ট আর মাথায় ছিল স্টারের লোগো দেওয়া লাল ক্যাপ। প্লেটেও স্টারের লোগো দেওয়া ছিল। আনাম একবার ওর পা বদল করবার সময়ে হঠাৎ করে নিশাতের পায়ে ওর পা লেগে যায়। দুজনা দুজনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। কিন্তু কেউই তাদের পা সরাল না। ওরা যতক্ষণ রেস্টুরেন্টে ছিল, তার পুরা সময়টাই তাদের পা একত্রে ছিল। রসিয়ে রসিয়ে কাবাব পরাটা খেতে খেতে বেশ রাত হয়ে যাচ্ছিল। নিশাতের বাসায় যাবার তাড়া আছে তাই ওরা তাড়তাড়ি খাওয়া শেষ করল। আনাম একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে নিশাতকে ওর বাসার সামনে নামিয়ে বাসায় চলে এলো। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই আনাম হয় চকে যাবার সময়ে বা চক থেকে ফিরে আসবার সময়ে নিশাতের ডিসডেন্সারি হয়ে আসতে শুরু করল। আনাম প্রতিদিনই নিশাতের জন্য কিছু না কিছু প্রেজেন্ট আনত। নিশাতও অধীর আগ্রহ নিয়ে আনামের আসবার অপেক্ষায় থাকত। পাঁচ ছয় দিন পরে আনামই কথাটা উঠাল। ইতিমধ্যে আনামের কাছে নিশাত ‘নিশি’ হয়ে গিয়েছে। তবে আনাম আনমই রয়ে গিয়েছে। 

“নিশি, আমি কিন্তু গ্রান্ড নওয়াবের বিরিয়ানির কথা ভুলি নাই। কবে যেতে চাও?” 

“আমিও খুব আগ্রহী। শুক্রবার শনিবার ছুটির দিন আব্বু বাসায় থাকবেন। তাই ঐ দুদিন বাদ। রবিবার যাওয়া যেতে পারে।” 

“নিশি, আমরা যে দিনই যাই না কেন, দুপুরের লাঞ্চ টাইমে তোমার বাসায় যাওয়া হবে না।” “অসুবিধা নেই। পাবলিক লাইব্রেরিতে পড়তে যাব বলে আমি দুপুরে বাসায় যাওয়াটা স্কিপ করব।”

শনিবার বেলা এগারটার দিকে আনাম নিশাতকে উঠিয়ে নিয়ে একটা বেবিট্যাক্সি করে সাত রওজা চলে এলো। মেইন রাস্তার ওপরেই চাকচিক্যবিহিন ছোট্ট চার/পাঁচ শ’ স্কায়ার ফিটের রেস্টুরেন্ট ‘গ্র্যান্ড নওয়াব’। বসে খাবারের জন্য তিন চারটা টেবিল আর চেয়ার আছে। সব কটা টেবিলই ভোজনবিলাশী দিয়ে পূর্ণ ছিল। বসবার জায়গা পাবার জন্য ওদের একটু অপেক্ষা করতে হয়েছিল। পোশাক আশাক আর কথাবার্তা শুনে সারিকা বুঝল যে ভোজনবিলাশীদের নব্বই ভাগই নতুন ঢাকার। দোকানে বসবার কিছুক্ষণের ভেতরে ২টা প্লেট ভর্তি সুস্বাদু কাচ্চি বিরিয়ানি আর তার সাথে একটা বেশ বড় সাইজের জালি কাবাব চলে এলো। সারিকার পছন্দের বোরহানি আনাম ভুলে নাই। পোলাওটা করা হয়েছিল বাশমতি চাল দিয়ে। বিরিয়ানিতে বাটার ওয়েলের প্রাচুর্য় ছিল। সঠিক তাপে আর ঠিক দমে রান্না হযেছিল বলে পোলাওটা ছিল ঝড়ঝড়ে আর নরম। খাসির মাংসর টুকরা ছিল বিশাল তবে ছিল অপূর্বভাবে সুস্বাদু, নিখুতভাবে সেদ্ধ আর মসল্লা ছিল একদম পরিমান মত। গতানুগতি মসল্লা ছাড়াও আরো কিছু একটা ছিল (যেটা সব সময়েই গোপন রাখা হয়) যা খাসির বটিটাকে আরো মোলায়েম ও সুস্বাদু করেছিল। নিশাত আগে কোনদিন গ্রান্ড নওয়াবের কাচ্চি বিরিয়ানি খায় নাই তাই সে অভিভূত হয়ে গেল, বললো, 

“আনাম, তুমি এই অপূর্ব খানার সন্ধান পেলে কি ভাবে। তুমি কি আগেও এখানে এসেছিলে। এখানে কোন কিচেন দেখছি না। এত ছোট দোকানে ব্যবসা নিশ্চয়ই খুব একটা হয় না।” 

“ওদের কিচেনটা একটু দূরে, একটা আলাদা জায়গায়। আর ওদের আসল ব্যবসা হল ক্যাটারিং ও টেক-আউট। আর ঐ দেখ বেশ কয়েকজন বিদেশি মানে সাদা চামড়া এখানে খেতে এসেছে। আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয় অস্ট্রেলিয়ার টিভি শো ‘মাস্টার শেফ, অস্ট্রেলিয়া’ কয়েকজন বিচারক এখানে এসে খেয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ এই ছোট্ট রেস্টুরেন্টের নাম বিদেশেও ছড়িয়ে গেছে। আমি এখানে বেশ অনেকবার এসেছিলাম। আমি এর সন্ধান পাই আমার এক আন্তরঙ্গ বন্ধুর কল্যানে। আর সেটাও ছিল বেশ মজার। আমরা তখন সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার এক বন্ধু, এক শিল্পপতির ছেলে, পাভেলের বিয়েতে।” 

“চাপা মারার জায়গা পাও না? শিল্পপতির ছেলের বিয়ে এই রকম খাবার দোকানে হবে, এটা আমাকে বিশ্বাস করতে বল।” 

“আসলে ব্যাপারটা সে রকম না। আমরা দুই বন্ধু একই স্কুলে, একই কলেজে এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ে, তবে ভিন্ন ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে, পড়তাম। পাভেল পড়াশোনার সুবিধার্থে হলে থাকত। ওর মামাত বোন সুফিয়ার সাথে ওর গভীর প্রেম ছিল। দুই বাসাতেই সম্পর্কটা মেনেও নিয়েছিল। আমরা তখন প্রথম বর্ষে পড়তাম। সুফিয়ার আর ধৈর্য ছিল ছিল না। ওর জোড়াজুড়িতে পাভেল আর সুফিয়া তখনই কাজি অফিসে যেয়ে বিয়ে করে। কাজি সাহেব সুফিয়াকে ওর দিকের সাক্ষীর কথা জিজ্ঞাসা করলেন, সুফিয়া কোন রকম চিন্তা না করেই আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বলেছিল যে ‘উনি আমার খালাত ভাই’। আমাদের আর এক বন্ধু হয়েছিল পাভেলের চাচাত ভাই। আমার তখন মনে হয়েছিল যে কাজি সাহেব আমাদের কথা বিশ্বাস করেন নাই তবে কোন রকম জিজ্ঞাসাবদও করেন নাই। বিয়ের পর আমার সবাই দল বেধে এখানে খেতে এসেছিলাম। সেটাই আমার এখানে প্রথম আসা। অবশ্য এর পরে আরো বেশ কয়েকবার এখানে এসেছিলাম।” 

“প্রথমবার তো বন্ধুর গার্লফ্রেন্ডের সাথে এসেছিলে। পরে কোন গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে এসেছিলে।” 

“পরে আমার এই গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে এলাম।” 

গার্লফ্রেন্ড বলাতে নিশাত যে রকম খুশি হয়েছিল তার চেয়ে বেশি পেয়েছিল লজ্জা। কোনমতে বললো, 

“আনাম আমাকে এই রকম অপূর্ব বিরিয়ানি খাওয়াবার জন্য ধন্যবাদ। চল এখন যাওয়া যাক।”

সেদিন দুপুর থেকেই কোন এক কারণে সারিকার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছিল, শরীরটাও ম্যাজম্যাজ করছিল, জ্বর জ্বর ভাব ছিল। সন্ধ্যার একটু আগে সরিকা মা শবনমকে নিয়ে ডা. নিশাতের কাছে এলো। নিশাতের চেম্বারে ঢুকে দুজনেই একটু অবাক হয়ে গেলেন আর সেই সাথে খুশিও হলেন। তখন আনাম টেবিলের উপরে রাখা নিশাতের হাত ধরে হাসি মুখে গল্প করছিল। 

“কিরে ভাইয়া, তুই বলে এই ভূয়া ডাক্তারের কাছে থেকে কোন পরামর্শ নিবি না। তবে আজ ওর হাত ধরে কি পরামর্শ নিচ্ছিস। মা, মনে হচ্ছে তোমার আশাটা পূরণে কোন অসুবিধা হবে না। আর নিশাত আপু দেখ তো আমার মাথা ব্যথা করছে, শরীরটাও কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে আর একটু জ্বর জ্বর ভাব আছে।” 

নিশাত সারিকাকে ভাল ভাবে দেখে বললো, 

“সারিকা তোমার বিশেষ কিছুই হয় নাই। সামান্য ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে। ওষুধ লিখে দিচ্ছি, ওগুলো নিয়মমত খাবে আর রেস্টে থাকবে। সাপ্তাহখানেক তোমাকে একটু ভুগাবে।” 

“নিশাত আপু ধন্যবাদ। আর ভাইয়া তোরা গল্প কর, আলপ কর, প্রলাপ কর যা খুশি কর আমরা আসছি।” 

“আনাম, সারিকা কি বলে গেল। আন্টির কি ইচ্ছার কথা বললো।” 

“তোমার আন্টি তোমাকে প্রথম দিন দেখেই তার পুত্রবধূ বানাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।” 

“তা আন্টির ছেলের কি ইচ্ছা।” 

“আন্টি ছেলে তার মায়ের ইচ্ছাটা এক শর্তে পূরণ করতে পারে।” 

“শর্তটা শোনা যাবে?” 

“শর্তটা খুব সহজ। এই ভূয়া ডাক্তারকে তার আন্টির ছেলের শুধু শরীরটা ঠিক রাখলেই চলবে না তাকে মানসিক ও শারীরিক সব দিক থেকেই সুখি রাখতে হবে।” 

“আমিও অনুরূপ একটা শর্তে রাজি থাকতে পারি। শর্তটা হল যে আন্টির ছেলেকেও এই ভূয়া ডাক্তারকে মানসিক ও শারীরিকসহ সব দিক দিয়েই সুখি রাখতে হবে।” 

দুজনেই এক সাথে বলে উঠল, 

“আমি রাজি।”

দুই মাসের ভেতরে আনাম আর নিশাতের বিশাল ভাবে বিয়ে হয়ে গেল। দুই পক্ষই বড়লোক, টাকা পয়সার অভাবে নেই। বিয়ের যত রকমের আনুষ্ঠিকতা অর্থাৎ ছেলে পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রস্তাব পাঠান, পানচিনি. গায়ে হলুদ ইত্যাদি সবই মানা হয়েছিল। সব চাইতে খুশি হয়েছিল সারিকা। সারিকা আর নিশাত খুব ভাল বন্ধু হয়ে গেল। সারিকা তার সব কথাই নিশাতের সাথে শেয়ার করত। বিয়ে আর বিয়ের পরবর্তী আচার অনুষ্ঠানাদির ঝামেলা শেষ করে নিশাত সেই বছর বিসিএস পরীক্ষা দিতে পারে নাই। তবে পরের বছর সরকারি হেলথ ক্যাডারে সিলেক্ট হয়েছিল। সদ্য পাশ করা বিসিএস ডাক্তারদের পোস্টিং করা হয় ঢাকার বাইরে। নিশাতকে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল নাইখ্যাংছড়িতে। অনেক চেষ্টার পরও নিশাতের ঢাকায় পোস্টিং দেওয়া সম্ভব হয়েছিল না, তবে নিলফমারিতে পোস্টিং-এর একটা সম্ভাবনা ছিল। নিশাত স্বামী ছেড়ে যাবে না বলে আর চাকরিতে যোগদান করল না। নিশাত মহল্লার আগের ডিসপেন্সারিতেই রোগী দেখতে থাকল।

সরিকা নিশাতকে সেই ছেলেটার কথাও বললো। 

“কি রে প্রথম দেখাতেই প্রেম?” 

“ভাবী তুমি তো প্রথম দেখাতেই ভাইয়ার প্রেমে পরে গিয়েছিলে। তাই আমাকেও সেই রকম ভাবছ।” “সারিকা, এটা ঠিক যে প্রথম দেখাতেই তোর ভাইয়াকে আমার ভাল লেগে গিয়েছিল। ওটা প্রেম ছিল কি না বলতে পারব না। প্রেম তো হতে হয় দুই পক্ষের ভেতরে। অবশ্য ভালবাসা বা ভাললাগা এক পক্ষেরও হতে পারে। ভাওতাবাজি ধরা পরায় তোর ভাইয়ার চেহারাটা হয়েছিল দেখার মত। একদম ধরা পরা গরু চোরের মত। আর ধরা পরে তোর ভাইয়াও ভীষণ রেগে গিয়েছিল। তা তোর জ্যাসন স্ট্যাথাম নাকি স্টিভেন সিগালের দেখা পেলি।” 

“হ্যাঁ খোঁজ পেয়েছি, তবে এখনও আলাপ হয় নাই। সামনের শুক্রবার ছুটির দিনে চল তোমাকে দেখাব। আমি নিশ্চিত যে ভাইয়াকে দেখবার আগে ওকে দেখলে তুমিও ওর প্রেমে পরে যেতে।” 

“ভাগ্যিস দেখি নাই। নইলে তোর ভাইয়াকে পেতাম না আর আমার এই মিষ্টি দুষ্ট ননদকেও পেতাম না। শুক্রবার, ছুটির দিনে তোর ভাইয়া বাসায় থকেবে। তাই শুক্রবার বাদ। শনিবার যাওয়া যেতে পারে। তা তোর হিরো কি করে ?” 

“কি করে জানি না। তবে ওকে রাপা প্লাজার একটা কসমেটিক্সের দোকানে বসতে দেখেছি।” 

“তুই আর মানুষ পেলি না শেষ পর্যন্ত একজন সেলসম্যানকে পছন্দ করলি।” 

“ভাবী আমি নিশ্চিত যে ও সেলনসম্যান না। ওকে আমি ছুটির দিন ছাড়া অন্য কোনদিনই দোকানে দেখি নাই।” 

“তুই দেখি অনেক খোঁজ খবর নিয়েছিস। তুই দেখি স্টিভেন সিগালের প্রেমে গলা পর্যন্ত ডুবে গেছিস।” 

“ভাবী, স্টিভেন সিগাল পারফেক্টলি এ্যকশন ছবির হিরো হলেও একটু মোটা, আর কেমন যেন নাকে নাকে কথা বলে। আমার পছন্দ জ্যাসন স্ট্যাথাম। জ্যাসন ঋজু আর পেটা শরীরের অধিকারী, বিভিন্ন এ্যকশন থ্রিলার ফিল্মে কঠিন দুধর্ষ আর হিংস্র চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পৃথিবী জুরে জনপ্রিয়। আমি জ্যাসনের প্রেমে গলা পর্যন্ত না নাক পর্যন্ত ডুবে আছি। আমি ওর প্রেমে পুরাটা ডুবে যেতে চাই।”

কাঙ্ক্ষিত শনিবারে ভাবী আর ননদ মিলে রাপা প্লাজায় এলো। জনিই আগে ওদের দেখতে পেয়েছিল। “শাহাব, দেখ ঐ মেয়েটা আজ আবার এসেছে। কিছু কিনবে না শুধু শুধু দাম জিজ্ঞাসা করবে। সাথে দেখি এক সুন্দরীকেও নিয়ে এসেছে। ভালই হবে আমরা দুজন ওরাও দুজন।” 

ওদের ভাগ্য এতই যে ভাল সেটা তারা আন্দাজও করতে পারছিল না। নিশাত সোজা শাহাবের কাছে এসে বললো, 

“এই যে ভাই আপনাদের কাছে মেয়েদের ভাল ভাল পারফিউম কি কি আছে দেখান তো।” 

শাহাব হাতের কাছে যা যা পেল সেসব নামিয়ে ওদের দেখাতে শুরু করল। নিশাত হেসে বললো, 

“এই ছেলে, তুমি তো পারফিউমও চেনো না আর ইউ ডি টয়লেটও চেনো না। আর তুমি যা দেখিয়েছ সে সব গুলো তো ছেলেদের। তুমি সেলসম্যান কি না আমার সন্দেহ আছে।” 

ভাবীর কথা শুনে শাহাবের চুপসে যাওয়া মুখটা দেখে সারিকা খুব মজা পেল। দোকানের এক সেলসম্যান এসে শাহাবকে তার শোচনীয় অবস্থা থেকে উদ্ধর করল। বেশ কয়েকটা মেয়েদের পারফিউম বের করে বললো, 

“আপা কিছু মনে কবেন না। ও নতুন তাই বেশি কিছু জানে না।” 

ননদের সাম্ভব্য প্রেমিককে বাগে পেয়ে নিশাত আরো একটু মজা করবার লোভ সামলাতে না পেরে শাহাবকেই জিজ্ঞাসা করল, 

“এই ছেলে জর্জি আরামানির, শানেল ৫, ব্লুবেরী এগুলোর দাম কত?”

শাহাব কোনটিরই দাম জানে না। তাই পাশে কর্মচারিকে জিজ্ঞাসা করে দাম বলা শুরু করলো। নিশাত শাহাবকে আরো ঘাবরে দেবার জন্য ৭৫ এমএল-এর ‘নোইং’-র উডি ফ্লাওয়ার মাস্ক পারফিউম চাইল। শাহাব পাশের কর্মচারিকে জিজ্ঞাসা করবার আগেই নিশাত বললো, 

“থাক তোমাকে আর বলতে হবে না। আমি বুঝতে পেরেছি যে এই ছেলে আসলে সেলসম্যান না। এখানে বসে মেয়েদের সাথে একটু দুষ্টামি, একটু ফ্লার্ট করবার জন্য। এই ছেলে এসো এবারে আমরা তোমাদের সাথে একটু ফ্লার্ট করব। তুমি আর তোমার বন্ধু, চল আমরা কোথাও বসে চা খেতে খেতে পরিচিত হই।” 

জনি আর শাহাব দুজনে বত্রিশ বত্রিশ চৌষট্টিটা দাঁত বের করে হেসে বললো, 

“ঠিক আছে আপু, চলেন। আপনারা কিন্তু আমাদের এখানে এসেছেন মানে আমাদের গেস্ট। চায়ের বিলটা কিন্তু আমরাই দেব।” 

“তোমাদের একজনের ভাগ্য খারাপ। আমি কিন্তু ভাবী। তোমরা যখন খাওয়াবে তখন আমাদের আপত্তি নেই আর তোমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পার যে বিলটি কিন্তু মোটাই হবে।” 

“সেটা কোন সমস্যা হবে না। ব্যাঙ্ক আমাদের সাথেই আছে। আমার বন্ধু জনিদের দোকান ওটা।” “ভাবী ঐ শুয়রের কথা শুনবেন না। আমাকে কিন্তু বাপের কাছে হিসাব দিতে হবে।” 

“দোস্ত ওটা তোর সমস্যা। বাপকে বলবি যে দুই বান্ধবীকে চা খাইয়েছিস।” 

“দোস্ত এক বান্ধবীর কথা বলাই সমস্যা আর সেখানে দুই বান্ধবী।” 

“ভাবী আজকে দোস্তকে বাগে পেয়েছি। চলেন আজকে জনিকে বাপের প্যাদানি খাবার ব্যবস্থা করি।” চারজনে মিলে কাছের ‘সসলিজ বেকারি’তে এসে বসলো। নিশাতই আরম্ভ করলো, 

“আমি নিশাত আর আমার ননদ সারিকা, ইডেনে পড়ছে। এই যে জ্যাসন স্ট্যাথাম আর জনি এবারে তোমাদের পরিচয় বল।” 

“জ্যাসন স্ট্যাথাম আমার প্রিয় অভিনেতা, আমি উনার ফ্যান। আমার নামকরণ কে বা কেন স্ট্যাথাম করলো তা জানি না তবে জানতে আগ্রহী। ভাবী আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমরা কেউই সেলসম্যান নই। আমার নাম শাহাব আর আমার বন্ধুর নাম তো জানেন। দুজনেই ঢাকা কলেজে আইএসসি পড়ছি, দ্বিতীয় বর্ষে আছি। আমরা ছুটির দিনে কিছু সময় দোকানে বসি আপনার কথামত আপনার ননদের মত মেয়েদের সাথে একটু আধটু ফ্লার্ট করবার জন্য।” 

“স্ট্যাথাম তোমার কি মনে আছে একবার তুমি ধানমন্ডির ৫ নম্বর সড়কে ছিনতাইকারির খপ্পরে পরেছিলে। তুমি যেন কি এক কায়দা করে ঐ ছিনতাইকারির হাত ভেঙ্গে দিয়েছিলে। তখন আমার ননদ আর তার বান্ধবী তোমার একশন দেখে মুগ্ধ হয়ে তোমার নামকরণ করেছিল জ্যাসন স্ট্যাথাম।”

শাহাব এতক্ষণ সারিকাকে ভালভাবে লক্ষ্য করে নাই। মুগ্ধতার কথা শুনে এবারে ভাল করে সারিকাকে দেখলো। সারিকা মেয়েটা খুবই সুন্দরী, ওর ভাবীর চেয়ে সুন্দরী। স্লিম ফিগারের মেয়েটা লম্বায় সাধারণ বাঙালি মেয়েদের মতই। পরনে লাল পাইপিং করা বাসন্তী রঙয়ের কামিজ আর তার সাথে লাল রং-এর ওড়না। ওড়নাটা খুব শালীনভাবে বুকের ওপরে টেনে দেওয়া। ঢিলা পাজামাটা সম্পূর্ণ সাদা কাপড়ের। নিতম্বটা মানাসইভাবে একটু ভারির দিকে। বড় চোখ দুটা কাজল দিয়ে টেনে হরিণ চোখা করে রেখেছে। নিতম্ব পর্যন্ত লম্বা, ভাজহীন লম্বা ইউ শেপ করে কাটা ঘন কালো পাতলা সিল্কি চুলগুলো ভাঁজ করে পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে আটকান। মেয়েটা মাথা নিচু করে আড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। দুই চোখের মিলন হওয়ার সাথে সাথে মনেরও মিলন হয়ে গেল। দুজনার দুজনকে ভাল লেগে গেল।

সবাইকে দুপুরে বাসায় লাঞ্চ করতে হবে, তাই সবাই হালকা কিছু খাবারের পক্ষে মত দিল। নিশাত চারজনের জন্য চারটা স্যন্ডউইচ আর কফির অর্ডার দিল। কফি খেতে খেতে দুই পক্ষই নিজেদের বাবা, মা, ভাই বা বোন কে কি করে ইত্যাদি মোটামুটি ভাবে জেনে নিল। বোঝা গেল যে দুই পক্ষই মোটামুটি বিত্তশলী। খাওয়া শেষ হলে বিল এলো। নিশাত বিলটা নিয়ে, শাহাবকে একটা সুযোগ করে দেবার জন্য বললো, 

“জনি, তোমাকে আজ আর বাপের প্যাদানি খেতে হবে না। ভাবী থাকতে দেবররা বিল দেবে কেন। আজ আমিই বিলটা দিচ্ছি।” 

শাহাব নিশাতের ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে বললো, 

“ভাবী, আমাদের কফি খাওয়াবার জন্য ধন্যবাদ। তবে আমি আমাদের তরফ থেকে আপনাদের একটা ফিরতি চা খাবার অনুরোধ করছি। আপনারা রাজি হলে আমি খুশি হব।” 

Related Posts

Leave a comment

Captcha Click on image to update the captcha.